
গুম জীবনের আট বছর




মহান রাব্বুল আলামিনের প্রতি অসীম কৃতজ্ঞতা, যিনি আমাকে আবার মুক্ত জীবনে ফিরিয়ে এনেছেন। এই মুক্তি পেতে যাদের ত্যাগ-কুরবানি অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করেছে, সেই চিরবিস্মৃত জুলাই আন্দোলনের শহিদ ও গাজিদের প্রতি আমার হৃদয় নিংড়ানো শ্রদ্ধা, দোয়া ও কৃতজ্ঞতা।
আমার গুরু জীবনের দুরূহ অভিজ্ঞতা নিয়ে বই লেখার বিষয়ে আমাকে প্রধান অনুপ্রেরণা করেছেন আমার মা। আমার মা একজন প্রাজ্ঞ মানুষ। তিনি নিজেকে একজন লেখক হওয়ার কারণে লেখার যে দায়িত্ববোধের প্রয়োজন, সে সম্পর্কে তিনি সচেতন। তিনি আমাকে সর্বদা বলতেন যে, আমার জীবন-অভিজ্ঞতা একটি দৃষ্টান্তস্বরূপ দলিল হতে পারে। আমার বন্দিজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে অনেকে আল্লাহর প্রতি, মানবতার প্রতি বিশ্বাসকে দৃঢ় করার উপাদান পেতে পারে। পাশাপাশিই জুলুমের বিপরীতে অবিচল থাকার শক্তিও কেউটা সংযত করতে পারে। আমার মায়ের উৎসাহে আজ আমি লেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
আমি যখন বইটির কাজ শুরু করি, তখন খুবই অসুস্থ। মুক্ত জীবনে ফিরেছি বটে, কিন্তু আট বছরের দীর্ঘ ও অমানবিক বন্দিত্ব আমার শরীরে ও মনে এমন ধকল রেখে গিয়েছে, তখনও কলম ধরার শক্তিও পাচ্ছিলাম না হাতে। আর একদিকে পালপন করে বয়ে যাচ্ছিল সময়। স্বাভাবিকভাবেই সময় যত সুন্দর হয়, যেকোনো বিষয়ের আবেদন তত কমতে থাকে। তাই অনুপ্রব করছিলাম, এখনই লেখা শুরু করা উচিত।
অবশেষে আমার স্বজনরা এগিয়ে এলেন। তাদের পরামর্শে আমি আমার স্মৃতিকথা বলে গিয়েছি এবং সেগুলো অডিও রেকর্ড করেছি। আর সেই অডিও রেকর্ড থেকে শ্রুতিলিপন করার শ্রমসাধ্য কাজটি করার দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছেন আমার বড়ো বোন এবং এই বইটির সহলেখিকা হাসিন সিদ্দিকা নিলু।
তাইহেবা এবং তার স্বামী, আমার দুলাভাই ড. সাইফুল ইসলাম। তারা দিনরাত পরিশ্রম করে কাজটি সুচারুরূপে সম্পন্ন করেছেন। এই বইটি রচনার পুরো প্রক্রিয়াজুড়ে সময় ব্যয় করেছেন ড. সাইফুল ইসলাম। তিনি লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ থেকে শুরু করে প্রকাশকের সঙ্গে সেতুবন্ধন তৈরির করেছেন। আমাকে আরও সহযোগিতা করেছেন মালয়েশিয়ার পিএইচডি গবেষক এবং আমার মেয়ে বেন সুমাইয়া রাবেয়া ও তার হাজারো সাগরেদ আব্দুল্লাহ। সার্বিক পরামর্শ দিয়ে গেছেন আমার ছোটো বোন তোহেরা হোসেন এবং তার স্বামী, কুবির পিএইচডি গবেষক মুখলেছ হোসেন। তাদের সক্রিয় সহায়তায় ও পরামর্শে বইটি লেখা সম্পূর্ণ হয়েছে।
আমি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি তাদের, যারা সারা বিশ্বে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ফোন, মেসেজ, ই-মেইলযোগে করে আমাকে উৎসাহিত করেছেন 'স্মৃতিকথা লিখতে', আমার বন্দিজীবনের গল্পটা বলতে। তারা আমার লেখার সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়ধারার অজানা কথা জানিয়েছেন। তাদের নিঃস্বার্থ উদ্বুদ্ধতা আমি ভুলব না। বন্দিজীবনের দুঃসহ দিনগুলোর কাটালাম, সেটাই সবার সাথে শেয়ার করা আমার দায়িত্ব—যাতে মানুষ জানে জুলুমের দুনিয়ায়ও কীভাবে আল্লাহ তায়ালা আমাকে তাওফিক দিয়েছেন দীনধর্মের কাজ চালিয়ে যেতে।সেই উদ্দেশ্য থেকেই যদি একজন মানুষও ঈমানের দুঃসহ জীবনযাত্রার উপাদান পায়, তাহলেই হবে এই বইয়ের সফলতা। ইনশাআল্লাহ।
আরেকটি বিষয় আমি স্পষ্ট করতে চাই। 'আয়নাঘর' এখন একটি প্রতিশব্দ নাম। গোপন কারাগার বোঝাতে এই শব্দটির ব্যাপক ব্যবহার হচ্ছে। কিন্তু আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে বা সরকারি সংস্থাগুলোর ডিডিএফআইয়ের গোপন বন্দিশালাকে 'আয়নাঘর' বলা হয়ে থাকে। এর বাইরে বিভিন্ন বন্দিশালার বিভিন্ন নাম ছিল। আমি বন্দি ছিলাম তিন আরেকটি বন্দিশালায়। আমাকে রাখা হয়েছিল র্যাবের পরিচালিত টিকাফাই সেলে। এই টিকাফাই সেলের পূর্ণ নাম হচ্ছে ট্যাকটিকাল ফোর্স ইন্টারোগেশন। সেটার ফরমাল নাম 'আয়নাঘর' নয়। কিন্তু 'আয়নাঘর' শব্দটি থেকেই প্রতিনিয়ত হয়ে গেছে এবং এটার ব্যবহারিক অর্থ দাঁড়িয়ে গেছে গোপন বন্দিশালা, সেহেতু সকলের বোঝার সুবিধার্থে বইয়ের নামে 'আয়নাঘর' শব্দটি রাখা হয়েছে। বিষয়টি সচেতন পাঠকদের জ্ঞাতার্থে উল্লেখ করে রাখলাম।
আমার বন্দিজীবনের দিনগুলোতে খুব বেশি বৈচিত্র্যপূর্ণ ছিল না; কিন্তু মানসিকভাবে ছিল প্রচণ্ড কষ্টকর। প্রায় প্রতিটি দিন একেকটি কঠিন অভিজ্ঞতা হতে। তাই দীর্ঘ আট বছর সংকলন হয়ে গেছে অল্প কিছু স্থূল স্মৃতিমালা। আরেকটি বিষয় হলো—আমার বন্দিত্বের একটি উল্লেখযোগ্য সময়কাল বেশিরভাগ ছিল সময় না জানা। সেটি ছিল এমন এক বন্দিশালা, যেখান থেকে দিনরাতের বোঝার উপায় ছিল না। বেশ কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় ধীরে ধীরে সময় আন্দাজ করতে শিখি। বিশেষ করে খাবার সরবরাহের তফাত অনুমান করে আমি সময় অনুমান করতাম। প্রহরীদের অসতর্ক কথাবার্তা থেকেও আমি সময় অনুমান কিছুটা করতে পারি। সেই অনুমিত সময়ের ওপরই আমি মামলাবাজ সময় ঠিক করতাম। কিন্তু যখন লিখতে শুরু করি, তখনও বিভিন্ন বিবরণী সময় ঠিকভাবে উল্লেখ হচ্ছিল না এবং সেই লেখার সময় যদি প্রাথমিক দিন থেকে গণনা করতে হয়, কিন্তু বস্ত্তগতভাবে—সেটা বুঝতে আমাদের চলে গেছে প্রায় এক বছর। বন্দিশালার এ রকম অনন্তকালীন ঘটনা-মনস্তত্ত্ব, সময় আর বিচ্ছিন্নতার মধ্যে আমি অনেক পেয়েছি, কিন্তু বর্ণনা পেছপা ৬ ঘণ্টারধার ঠিক ব্যাখ্যার জন্য সচেতন আমি ধারাবাহিকতায় উল্লেখ করে গিয়েছি।
সবশেষে পাঠকের কাছে অনুরোধ, আমার উপস্থাপনে যদি কোনো ভুলত্রুটি পরিলক্ষিত হয় বা কোনো অসঙ্গতি দেখতে পান, আমাকে জানাবেন।ইনশাআল্লাহ, পরবর্তী সংস্করণে সেই ত্রুটি সংশোধন করে নেব। বইটি প্রকাশে যে যেভাবে সহযোগিতা করেছেন, উৎসাহ জুগিয়েছেন, প্রকাশের দায়িত্ব নিয়েছেন, সকলের প্রতি আমার অন্তর থেকে কৃতজ্ঞতা। আল্লাহ তায়ালা আমাদের-আপনাদের সকলের চেষ্টা কবুল করুন। আমিন।
ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম (আরমান)
১২ আগস্ট, ২০২৫

বাসায় ঢুকে হাত-মুখ ধুয়ে সবাইকে নিয়ে একসাথে খেতে বসার প্রস্তুতি নিচ্ছি। হঠাৎ দরজায় করাঘাত—ঠক ঠক! কয়েক সেকেন্ড বিরতি দিয়ে প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা দেওয়া হলো দরজায়। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত সাড়ে ১১টা।
দৌড়ের দরজার কাছে গেলাম। কি-হোল দিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম, বাইরে কারা। ৮-১০ জন দীর্ঘদেহী লোককে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল। মুহূর্তে বুঝে ফেললাম—এরাই তারা, যারা সারা দিন ধরে একটি মাইক্রোবাসে আমাকে ফলো করেছে।
আমার স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের জানা ছিল, আমাকে বিভিন্ন জায়গা থেকে ওয়ার্নিং দেওয়া হচ্ছে। তারা ততক্ষণে বুঝে গেছে দরজায় অপেক্ষমাণ লোকগুলো আমাকে তুলে নিয়ে যেতে এসেছে। আমার ছোট বোন খুবই সাহসী মনোভাব নিয়ে বলল, 'ভাইয়া, আমরা দরজা খুলব না। তারা একটি সিনক্রিয়েট করুক। প্রয়োজনে দরজা ভেঙে ঢুকুক। তারপরও আমরা দরজা নিজ থেকে খুলব না।
বোনের সাথে সুর মিলিয়ে আমার স্ত্রী ও খুব দৃঢ়চিত্তে একই কথা বলল। তারা দুজনই কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলল। খুব সাহসের সাথে তারা দুজনই এগিয়ে গেল দরজার দিকে।এক অজানা আশঙ্কা ঘিরে ধরল আমাকে। একজন আইনজীবী হিসেবে আমি দেখেছি আদালতপাড়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজন কীরকম হঠকারী আচরণ করে! তাদের দুর্ব্যবহারের ক্ষেত্রে নারী-শিশু-বৃদ্ধ কোনো বাছবিচার থাকে না। এখন তাদের সাথে যদি কো-অপারেট না করি আর যদি তারা দরজা ভেঙে বাসার ভেতরে ঢোকে, তাহলে আমাকে এবং পরিবারের মেয়েদেরকে অপমান-অপদস্থ করতে পারে। আমি চাই না আমার বাচ্চাদের সামনে এ রকম কোনো পরিস্থিতি তৈরি হোক। এমন পরিস্থিতি বাচ্চাদের কোমল মনে ভয়ানক ভীতি তৈরি করবে।
আগে থেকেই আমার ভাবনা ছিল, আমি যেকোনো মুহূর্তে গ্রেফতার হতে যাচ্ছি; কিন্তু কখনকালোও এমন হতে পারি এমনটা ভাবিনি। তাই গ্রেফতারের একটি মানসিক প্রস্তুতি আমার ছিল। আমার ওয়াইফ ও বোনকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, 'থাক, এখন এমন সিচুয়েশন ক্রিয়েট করা ঠিক হবে না। আমি দরজা খুলে দিচ্ছি। আর থানায় গেলে তোমাদের সাথে তো দেখা হবে!'
আমাদের বাসার দরজায় একটি চেইন আছে। সেটি লাগিয়ে দিলে দরজা একটু ফাঁক হয়ে আটকে থাকে; পুরোপুরি খোলে না। এটাকে 'চেইন লক' বা 'সিকিউরিটি হুক' বলে। আমি চেইনটি আটকাতেই দরজা হালকা ফাঁক করলাম।
কণ্ঠ যথাসম্ভব স্বাভাবিক রেখে জিজ্ঞেস করলাম, 'আপনারা কারা?'
তারা বললেন, 'আপনাকে আমাদের সাথে যেতে হবে। আপনার সাথে আমাদের কিছু কথা আছে।'আমি ফের জিজ্ঞেস করলাম, 'কিন্তু আপনাদের পরিচয় কী? আপনাদের কোনো ইউনিফর্ম দেখছি না; সাদা পোশাকে দেখছি।'
এর কিছুদিন আগেই সুপ্রিম কোর্ট থেকে একটি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় বা ইউনিফর্ম ছাড়া কেউ গ্রেফতার করতে পারবে না। আমি বিষয়টির দিকে ইঙ্গিত করলাম। তারা সবাই বেশ দীর্ঘদেহী। যাকে সিনিয়ার কোনো অফিসার বলে ঠাহর হচ্ছে, তার কোমরে অস্ত্র ঝুলছে। বাকি সবার হাতে অস্ত্র। তাদের কয়েকটিতে একটি সিরিয়াল নম্বর লেখা আছে, যেটি আমি স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছি।
এবার তাদের ভাষা বেশ কড়া শোনাল, 'আমাদের ব্যাপারে এসব নিয়ম প্রযোজ্য না। আপনাকে আমাদের সাথে যেতেই হবে।'তাদের কথা ও বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বলে দিচ্ছে, না গেলে জোর করে নিয়ে যাওয়া হবে। তাই বাধ্য হয়ে বললাম, 'আপনারা একটু দাঁড়ান, আমি রেডি হয়ে আসছি।' এ কথা বলে তাদের সামনে দরজাটি লাগিয়ে দিলাম।.......